ফেনীতে সরিষার বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি

মাহাবুব আলম

ফেনী প্রতিনিধি: সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষে কৃষকরা জেলাজুড়ে সরিষা উৎপাদন করেছেন। চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘায় অন্তত ১০ হাজার টাকা হারে কৃষকরা লাভ পাওয়ায় আগামী মৌসুমে জেলায় সরিষা আবাদ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সরিষা ঘরে তুলে লাভ ভালো পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।

চলতি মৌসুমে ফেনীতে তিন হাজার ৪৯৪ হেক্টর আবাদ করা জমি থেকে চার হাজার ৭১৭ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হয়েছে। এসব সরিষা ভাঙলে জেলায় অন্তত এক হাজার ৬৫৭ মেট্রিক টন তেল ও দুই হাজার ৫৯৪ মেট্রিক টন খৈল পাওয়া যাবে। টাকার অংকে এ ফসল থেকে কৃষকদের আয় হবে অন্তত ছয় লাখ ২৬ হাজার টাকার বেশি।জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, ২০২২-২৩ রবি মৌসুমে জেলায় দুই হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি বিভাগ। আবাদ করা জমির মাঝে ফেনী সদর উপজেলায় এক হাজার ৪৬২ হেক্টর, ছাগলনাইয়ায় ২১২ হেক্টর, ফুলগাজীতে ৪৪০ হেক্টর, পরশুরামে ১২০ হেক্টর, দাগনভূঞায় ১৪০ হেক্টর ও সোনাগাজীতে এক হাজার ১২০ হেক্টর রয়েছে।

অনুকূল আবহাওয়ায় জেলায় চলতি মৌসুমে সরিষার ভালো ফলন হয়েছে। এখন চলছে আবাদ করা জমির সরিষা কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। সরকারিভাবে সর্বাধিক প্রণোদনা দেওয়া ও কৃষকদের আগ্রহের কারণে জেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৯৪ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়।

দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, এবার ১০ বিঘা জমিতে তিনি সরিষা আবাদ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। তিনি প্রায় এক হাজার ৭০০ কেজি সরিষা পেয়েছেন। এ সরিষা ভাঙলে প্রায় ৬০০ লিটারের বেশি তেল পাবেন। যার বাজার মূল্য ৩০০ টাকা হারে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। খৈল পাবেন প্রায় ১ হাজর ১০০ কেজি। যার বাজার মূল্য ৫০ হাজার টাকার মতো।

তার মতে, সরিষা বিক্রি না করে তা ভেঙে বিক্রি করলে অধিক লাভ পাওয়া যায়। তিনি ১০ বিঘায় উৎপাদিত সরিষা ভেঙে তেল ও খৈল বিক্রি করে প্রায় দুই লাখ টাকা পাবেন বলে মনে করছেন। সরিষা কাটা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন ভেজালমুক্ত সরিষার তেল কিনতে ইতোমধ্যে তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিঠুন ভৌমিক বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় তিন হাজার ৪৯৪ হেক্টর জমি থেকে অন্তত চার হাজার ৭১৭ মেট্রিক টন সরিষা পাওয়া যাবে। এসব সরিষা ভাঙলে এক হাজার ৬৫৭ মেট্রিক টন তৈল ও দুই হাজার ৫৯৪ মেট্রিকটন খৈল পাওয়া যাবে। টাকার অংকে জেলায় প্রতি কেজি ১০০ টাকা হারে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৭শ টাকার সরিষা পাওয়া যাবে। যা ভাঙলে ৩শ টাকা কেজির ৪ লাখ ৯৭ হাজার ১শ টাকার তেল ও ৫০ টাকা কেজির ১ লাখ ২৯ হাজার ৭শ টাকার খৈল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দাগনভূঞা ইয়ুথ সোসাইটির যুব সম্পাদক নজরুল ইসলাম সোহাগ জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলন পাওয়া গেছে। ধান বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় সরিষা আবাদ করে কৃষকরা ভালো লাভবান হয়েছেন। আগামীতে জেলায় এ ফসলের আবাদ আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করেন এ কর্মকর্তা।

ফেনী সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রণব চন্দ্র মজুমদার বলেন, চলতি মৌসুমে ফেনীতে প্রতি বিঘা সরিষা আবাদে প্রায় ৭ হাজার ২৬৭ টাকা খরচ পড়েছে। এর বিপরীতে প্রতি বিঘায় উৎপাদন হয়েছে ১৭৩ কেজি সরিষা। যার বাজার মূল্য কেজি ১শ টাকা হারে প্রায় ১৭ হাজার ৩শ টাকা। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় কৃষক সরিষা আবাদ করে প্রায় ১০ হাজার টাকা লাভ পাবেন। তা ভেঙে বিক্রি করলে এ লাভের পরিমাণ আরও বেশি হবে।

দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা আক্তার তানিয়া জানান, ফেনী অঞ্চলের কৃষকরা কৃষিতে উৎসাহী, ফলনের সুফল বুঝাতে পারলে তারা প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ভালো ফলনে যথেষ্ট উদ্যোমী। সরকারের পাশাপাশি কৃষিতে উৎসাহী করতে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

উপজেলার উত্তর কাশিমপুর এলাকার কৃষক শাহজাহান সাজু বলেন, তিনি প্রায় সাড়ে ৫ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছেন। এতে তার চাষাবাদ, বীজ, সার ও কীটনাশক, কাটা এবং মাড়াইয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সরিষা মাড়াই শেষে তিনি প্রায় সাড়ে ৯শ কেজি সরিষা পেয়েছেন। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি সরিষা ১০০ টাকা থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসেবে প্রায় ৯৫ হাজার টাকার সরিষা তিনি ঘরে তুলেছেন। বাজারে এ সরিষা বিক্রি করলে তিনি খরচ বাদে ৫৫ হাজার টাকার মতো লাভ পাবেন বলে আশা প্রকাশ করছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. একরাম উদ্দিন বলেন, জেলায় চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৩০০ হেক্টর আবাদের লক্ষ্য ছাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৯৪ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষাবাদ হয়। জমিতে বপন করা সরিষা কাটা ও মাড়াই শেষে জেলায় অন্তত ৪ হাজার ৭১৭ মেট্টিক টন সরিষা পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *