
ময়মনসিংহের ভালুকায় জীবিত ব্যক্তিকে মৃত এবং একই মৃত ব্যক্তিকে ওয়ারিশ দেখিয়ে বনের জমি সাফকবলা দলিল করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দলিলটি করা হয় গত ৭আগস্ট ভালুকা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে,যার নাম্বার ৫৪৯১/২৫। দলিলে যাকে মৃত দেখানো হয়েছে তিনি (তরিফ উল্লাহ) বাদী হয়ে ৬জনকে আসামী করে রোববার (১৭আগস্ট) ভালুকা মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এ ছাড়াও ওই দলিলে জমির প্রকৃত মূল্য ও ফ্লাটবাড়ি উল্লেখ না করে উৎসেকর ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, উপজেলার হবিরবাড়ি মৌজার ভালুকা রেঞ্জ অফিস লাগোয়া বনের জমি এসএ ১৭০, হাল ৭১৪৪ ও ৭১৪৮দাগে ৩তলা ফ্লাটবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করে মৃত আব্দুল মান্নানের স্ত্রী সন্তানরা ভোগ দখলে ছিলেন। ১৭০নং দাগটি বন বিজ্ঞপ্তি থাকায় তারা রেজিস্ট্রি করে দিতে পারছিলেন না। তাই জমির গ্রহীতা সিরাজুল ইসলাম ভালুকা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক হারুন অর রশিদ রুবেল(সনদ নাম্বার-৬৬৫৭) ও অফিসের এক কর্মচারীর সাথে মোটা অঙ্কের টাকা চুক্তি করে মহা জালিয়তির আশ্রয় নিয়ে একটি দলিল করেন।দলিলে দেখানো হয় হবিরবাড়ি গ্রামের তরিফ উল্লাহর (যাকে মৃত দেখানো হয়েছে) ছেলে মৃত আব্দুল মান্নান তার স্ত্রী মোছাঃ শামছুন্নাহার (৫২), তার অর্থাৎ আব্দুল মান্নানের ছেলে মোঃ জয়নুল আবেদীন (৩৪) ও মেয়ে মাহমুদা মান্নান প্রিয়াংকা (৩০)। আব্দুল মান্নান মারা যাওয়ার পর ওই সম্পত্তি ও খারিজমুলে স্ত্রী ও সন্তানরা হস্তান্তর করেন।
তরিফ উল্লাহর নামে হবিরবাড়ি মৌজার এসএ ৫৫৬,হাল দাগে ৫০শতাংশ জমির খারিজ রয়েছে যার নাম্বার ৪৬০০। জালিয়তচক্রটি হবিরবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি মৃত্যু সনদ উত্তোলন করেছেন সেখানে তরিফ উল্লাহর ছেলে দেখানো হয় আব্দুল মান্নানকে এবং তরিফ উল্লাহ ও আব্দুল মান্নানকে মৃত দেখানো হয়। আব্দুল মান্নান, তরিফ উল্লাহ কোনো ওয়ারিশান নন। চক্রটি ওই খারিজের হাল সনের খাজনা অনলাইনে পরিশোধ করে।গত ৭আগস্ট মৃত আব্দুল মান্নানের স্ত্রী ও সন্তানরা ওই এলাকার ভূমি জালিয়ত চক্রের অন্যতম হোতা মোঃ সিরাজুল ইসলাম (৬০) ও মোছাঃ আজমালা খাতুন (৪৮) নামে ১০ লাখ, ৫শত টাকা মূল্য দেখিয়ে সাব কবলা দলিল করেন। জমিটিতে বর্তমানের ৪ হাজার স্কয়ার ফুটের ৩ তলা ফ্লাটবাড়ি ও দোকানপাট রয়েছে। দলিলে ফ্লাটবাড়ি ও দোকানপাট উল্লেখ না করায় শতকরা ৩শতাংশ উৎসে কর ও ৩শতাংশ ভ্যাট টাকা ফাঁকি দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তরিফ উল্লাহ বাদী হয়ে থানায় সিরাজুল ইসলাম, আজমালা খাতুন, মোছাঃ শামছুন্নাহার,মোঃ জয়নুল আবেদীন,মাহমুদা মান্নান প্রিয়াংকা ও দলিল লেখক হারুন-অর-রশিদ রুবেল অভিযোগ দিয়েছেন। স্থানীয়রা অনেকেই জানান, এ অফিসে অহরহ জাল জালিয়তি হয়। রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের পাতা পাল্টানোর অভিযোগ রয়েছে। এসব জালিয়তি করে অফিসের কয়েকজন কর্মচারী ও জালিয়তচক্ররা বর্তমানে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।
দলিলটিতে বেশ কয়েকটি জালিয়তির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। প্রথমত তরিফ উল্লাহ জীবিত আব্দুল মান্নান তার কেউ নন। দ্বিতীয়ত জমি এক জায়গায় চৌহদি আরেক জায়গায় চৌহদি স্থল দলিলে উল্লেখ করা দাগের দুরত্ব ৩কিলোমিটার। তৃতীয়ত প্রকৃত মূল্য প্রায় দুইকোটি, বর্তমানে জমির শ্রেণি বাড়ি, দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে কান্দা। জমির গ্রহীতা সিরাজুল ইসলাম কয়েক বছর পূর্বে ওই মৌজা বহুতল ভবনের তথ্য গোপন করে জমি কবলা করলে বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রারের নজরে আসলে পরবর্তীতে ১৯ লাখ টাকা উৎসেকর ও ভ্যাট আদায় করা হয়।
তরিফ উল্লাহ জানান,আমি বর্তমানে জীবিত,আমাকে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক কিভাবে মৃত দেখালো? আব্দুল মান্নান আমার কেউ না। একটি চক্র আমাকে হয়রানী করার জন্য এ মহা জালিয়তির ফাঁদ পেতেছেন। এ ঘটনায় ৬জনকে আসামী করে থানায় একটি অভিযোগ দেয়া হয়েছে।
দলিল লেখক হারুন-অর-রশিদ রুবেল জানান,আমাদের কাছে জমিরদাতা ও গ্রহীতাগণ জমির কাগজপত্র নিয়ে এসেছেন আমি তা দেখে দলিল করে দিয়েছি। রুবেলকে প্রশ্ন করা হয় যেহেতু আপনার বাড়ি ওই এলাকায়,তাহলে আপনি কিভাবে সনাক্ত করলেন তরিফ উল্লাহর ছেলে আব্দুল মান্নান ও স্ত্রী সন্তানদেরকে। এ প্রশ্নের কোনো সদত্তোর দিতে পারেননি।
দলিল গ্রহীতা সিরাজুল ইসলাম জানান, জমির দাতাগণ আমাকে জমি কবলা করে দিয়েছে তারা তাদের যে সব কাগজপত্র দিয়ে সেটা তাদের বিষয়,আমি শুধু তাদেরককে জমির টাকা দিয়েছি। তাঁকে প্রশ্ন করা বর্তমানে ওই জমিতে তিন তলা ভবন ও দোকান রয়েছে জমি কবলা করার সময় উৎসেকর ও ভ্যাট দিলেন না কেন। এ ব্যাপারে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, দলিল সংশোধনের জন্য আদালতে মামলা করবো।
সাব রেজিস্ট্রার আনোয়ারুল হাসান জানান, আমার এখানে একটি দলিল হয়েছে। জমির সঠিক খারিজ ও দলিলপত্র দেখে আমি দলিল রেজেস্ট্রি করেছি। আমার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি, দিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভালুকা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ হুমায়ুন কবির জানান,এ ব্যাপারে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
